বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২, ২০২০




চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস, যিনি একই ভুল দ্বিতীয়বার করেননি

 

মহান গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস (৪৬০বিসি-৩৭০বিসি) কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়, যিনি দ্বিতীয় হিপোক্রেটিস নামেও পরিচিত। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র শেখাতেন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে; তিনি জোর দিতেন ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের এবং বিভিন্ন রোগের বিভিন্ন মৌলিক তত্ত্বের ওপর। তাঁর সম্পর্কে যে উক্তিটি এখনও আমাদের অনুপ্রানিত করে তা হল, ‘তিনি একই ভুল দ্বিতীয়বার করেননি’।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস মানবেতিহাসের ন্যায় প্রাচীন। অথচ একুশ শতকে এসে আজ সেই চিকিৎসাবিদ্যা এক মহা সংকটের সম্মুখীন। বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস ডিজিজ (কোভিড-১৯)। বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ৪৭,২৭৩ জনে দাঁড়িয়েছে; আক্রান্তের সংখ্যা ৯,৩৮,৩৭৩ (যদিও সংখ্যাটা প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে)। চীনের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রও আজ এই জৈব-মহামারির সামনে অসহায়।

বাংলাদেশেও এপর্যন্ত ৫৬ জন আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ছয় জনের। তবে অনেকের মতে এটা প্রকৃত চিত্র নয়, প্রকৃত চিত্র আরও খারাপ। কোভিড-১৯ উপসর্গ আছে এমন রোগীদের মধ্যে টেস্ট করার হার অনেক কম; প্রতিদিন আইইডিসিআর-এ যে পরিমাণ ফোন আসে, তার মধ্যে অল্প সংখ্যক নমুনাই পরীক্ষা করা হচ্ছে। অনেকে সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রন্ত হওয়া সত্ত্বেও নমুনা পরীক্ষা করাতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে তারা হয়ত নীরব বাহক হিসেবেই থাকছেন, এবং আক্রান্তের হিসেবেও আসছেন না। অনেকে এই ধরণের উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন, যারা মৃতের হিসেবেও আসছেন না।

সবথেকে খারাপ যেটা হয়েছিল, তা হল- দেশের অনেক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা করোনাভাইরাসের কারণে প্রথমে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঠান্ডা-সর্দি, জ্বর-কাশির রোগীকে তাঁরা এড়িয়ে যেতে চাইতেন। সংক্রমিত নয়; কিন্তু জ্বর, সর্দি বা কাশির সমস্যায় ভুগছেন- এমন রোগীকেও চিকিৎসা দিতে কেউ কেউ অনীহা প্রকাশ করেছিলেন, যদিও পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকেদের ভাষ্য ছিল তাদের চিকিৎসা দিতে আপত্তি নেই, কিন্তু তাদের নিরাপত্তামূলক পোশাক- পারসোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) থাকতে হবে।

প্রথম দিকে আমাদের পিপিই স্বল্পতা থাকলেও এখন সে সমস্যা নেই। করোনাভাইরাস ব্যাপক হারে ছড়াতে শুরু করার পর এখন স্থানীয়ভাবেই পিপিই উৎপাদন করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, পিপিই প্রস্তুত হতে হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে; স্পেসস্যুটের মতো দেখতে হলেই পিপিই হবে না। বিশ্বব্যাপী এই মহামারী প্রতিরোধে যখন দেশে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই পিপিই সংকটে ছিলেন, তখন অনেক প্রশাসনিক/ ব্যাংক কর্মকর্তারারা অহেতুক পিপিই ব্যবহার করেছেন। পিপিই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের বক্তব্য- ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের, এমনকি আমারও পিপিই ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কারণ, আমরা সরাসরি আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে যাই না। এগুলো তাদেরই দরকার যারা আক্রান্ত রোগীকে সরাসরি সেবা দেবেন।’

সব চিকিৎসকরাই কি ঠান্ডা-সর্দি, জ্বর-কাশির চিকিৎসা প্রদান করেন নি? আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি- আকস্মিকভাবে আমি এই মাসের ২০ তারিখে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন কনসালটেন্ট-র শরণাপন্ন হই। হাসপাতালে যাওয়ার সময় আমি কিছুটা দিধাগ্রস্থ ছিলাম, যেহেতু নিউমোনিয়া এবং কোভিড-১৯ এর সিম্পটম প্রায় এক। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম অনেক রুগী, এবং সবাই এসেছে রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগে। চিকিৎসকের সামনে থাকা অবস্থায় আমি খেয়াল করে দেখেছি তিনি শুধু সাধারণ হ্যান্ড গ্লাভস ও একটি এন-৯৫ রেসপিরেটর মাস্ক পড়ে আছেন। তো, সব চিকিৎসকরাই রোগী দেখেননি- কথাটি ঠিক নয়।

করোনাভাইরাস সংক্রামণের এই সময়ে সবারই দায়িত্ব ও নিরাপত্তার ধরণ অনুযায়ী পিপিই প্রয়োজন আছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনতো রয়েছেই, আছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, সংবাদকর্মী, মাঠ-প্রশাসন কর্মকর্তা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং আরও অনেকের। অনেক সরকারি অফিস/ ব্যাংকের তুলনায় ঔষধের দোকানে এখন ভীর বেশি হচ্ছে। তাই বলে তাদের সবারতো আর স্পেসস্যুট লেভেলের পিপিই প্রয়োজন নেই। গত ৩১ মার্চ গণভবনে এক মতবিনিময়কালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যাদের প্রয়োজন নেই, তাদের পিপিই ব্যবহারের দরকার নেই। পিপিই সবার ব্যবহারের জন্য নয়। এটি ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য। অযথা এর অপব্যবহার করবেন না।’

রোগজীবাণুর সাথে মানুষের যুদ্ধ চলেছে অনাদিকাল থেকে। দিনে দিনে রোগজীবাণু শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে উপশমের নতুন পন্থাও আবিষ্কৃত হয়েছে। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তা নিশ্চিতভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের হাত ধরেই এসেছে। আমাদের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে মহান সৃষ্টিকর্তার পরেই রয়েছে চিকিৎকদের অবদান। গত শতাব্দীর সেরা আবিষ্কারের জন্য যখন সমগ্র বিশ্বব্যাপী জরিপ করা হল, দেখা গেল হিগস-বোসন কণা, কিংবা রোবটিক্সের মতো প্রযুক্তিকে পিছনে ফেলে মানুষ এক্স-রশ্মি এবং পেনিসিলিনকে বেছে নিয়েছে।

সবাই এখন আশায় আছে, কখন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একটা ভ্যাকসিন আবিস্কার করবেন; কখন একটা এন্টিভাইরাল ড্রাগ নিয়ে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হবেন। পৃথীবিতে যে দুটি দেশ তাদের জিডিপি’র সবচেয়ে বেশি অংশ গবেষণায় খরচ করে, দক্ষিণ কোরিয়া তার একটি। কোরিয়া, এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষদের করোনা টেস্ট করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এই মহামারীতে যখন স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তখন আমরা যদি চিকিৎসাবিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদানের কথা এড়িয়ে যাই, তাহলে সেটা অশোভন হবে।

হিপোক্রেটিসের একটা দর্শন হচ্ছে, রোগীর চিকিৎসা কর, রোগের নয়। আজও চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেয়ার সময় যে শপথ পাঠ করতে হয় তা হিপোক্রেটিসের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। সব পেশাতেই ভুল দুইবার করার সুযোগ থাকে না, যেমন চিকিৎসাপেশায়। তবে হিপোক্রেটিস যেহেতু একই ভুল দ্বিতীয়বার করেননি, অবশ্যই তাঁর শিষ্যদেরও সেই গুণ রয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। হ্যাটস অফ টু অল দ্য মেডিকেল সাইন্টিস্ট, ফিজিশিয়ান অ্যান্ড হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স।

নজরুল ইসলাম : কলাম লেখক, প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ, দ্য কার্টার একাডেমি (মতলব উত্তর), ও এমফিল রিসার্স ফেলো, স্কুল অব এডুকেশন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়। ইমেইল : [email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category