বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১, ২০১৯




লাখো হৃদয়ের স্পন্দন মতলবের ড.মানযূর আহমাদ এর ৭ম ওফাত দিবস ও নেদায়ে ইসলাম কমপ্লেক্স

 

লাখো হৃদয়ের স্পন্দন মতলবের শায়খ ড. মানযূর আহমদ আল-আহমাদী ওয়েসী রি’ফায়ী (১অক্টোবর) ৭ম ওফাত দিবস। ২০১২ সালে তিনি হজ্ব করতে গিয়ে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন। নিজ কামনা ও বাসনা মোতাবেক জান্নাতুল বাক্বীতেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

তাঁর সুযোগ্য সন্তান শায়খ মাসউদ আহমদ আল আহমাদী উয়েসী রি’ফায়ী আরবী মাস অনুযায়ী গত ১৪-১৫ জিলক্বদ ১৮-১৯ জুলাই দু’দিন ব্যাপী ফরাজীকান্দি কমপ্লেক্সে পিতার ওফাত দিবস পালন করেন।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (র)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদের কৃতী সন্তান শায়খ মানযূর আহমাদ (র)। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায়। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি ভাল রেজাল্ট করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতেন। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। শায়খ মানযূর আহমাদ পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী স্টাডিজে মাস্টার্স ও আইনে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন এবং ‘হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নাকশবন্দ ও নাকশবন্দী ত্বরিকা’ শীর্ষক গবেষক ছিলেন।

শায়খ মানযূর আহমাদ সত্যিকার অর্থে আশিকে রসূল বা রসূল প্রেমিক ছিলেন। তিনি মনে করতেন রসূল প্রেম ছাড়া আল্লাহকে পাওয়া যাবে না। আল্লাহর ভালবাসা পেতে হলে রসূলের ইত্তেবা করা জরুরী। মিলাদ-কিয়ামের ওপরে তিনি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করতেন। কিয়ামে তার কাসিদা যখন সুললিত কণ্ঠে উচ্চারিত হতো তখন কিয়ামে অংশগ্রহণ করে সকল রসূলপ্রেমিক উদ্বেলিত হতো।

শায়খ মানযূর আহমাদের পিতা শায়খ বোরহানুদ্দীন (র) ১৯৪৯ সালে ‘নেদায়ে ইসলাম’ নামে একটি আধ্যাত্মিক মানবিক অরাজনৈতিক সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। নেদায়ে ইসলামের মাধ্যমে শিক্ষাকে সবার দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন নিজ উদ্যোগে নিজ গ্রাম চাঁদপুর জেলার মতলবের ফরাজীকান্দীতে।

১৯৪৯ সালে উয়েসীয়া আলিয়া মাদ্রাসা, ১৯৫২ সালে আল আমিন এতিমখানা, ১৯৫৬ সালে জিলানিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল (কারিগরি), প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে খাজা গরিবে নেওয়াজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ ২০টি প্রতিষ্ঠান নেদায়ে ইসলামের আওতাভুক্ত করেন। যা ১৯৪৯-১৯৬৪ সালের মাত্র ১৫ বছরের ক্ষুদ্র সময়ে একটি বিপ্লব বলা যায়। তাঁর স্বপ্ন ছিল আধ্যাত্মিক ও বিজ্ঞান শিক্ষার সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। কিন্তু ১৯৬৪ সালের ৮ মে মাত্র ৫১ বছর বয়সে মহান সাধক শায়খ বোরহানুদ্দীন (র) ইন্তেকাল করেন।

১৯৬৫ সালে তাঁর বড় ছেলে যুগশ্রেষ্ঠ সুফি শায়খ মানযূর আহমাদ উয়েসী (র) মাত্র ২২ বছর বয়সে নেদায়ে ইসলামে ২১তম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করে শায়খ বোরহানুদ্দীন (র)-এর আদর্শের বাস্তবায়ন ও আলীগড় আন্দোলনের পটভূমিকায় এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা ঢাকা মহানগরীর প্রথম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।

কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে জানা যায়, নেদায়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের নামানুসারে ঢাকায় শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নেদায়ে ইসলাম এডুকেশন সাব কমিটির সভায় এবং এ কলেজের জন্য একটি এডহক কমিটিও গঠন করা হয়। যার চেয়ারম্যান করা হয় ঢাকার শেষ নবাব নবাব হাসান আসকারী সাহেবকে। সলীমুল্লাহ ফাহমী, অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস অফিসার আবদুর রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সাইয়্যেদ আবদুল হাই, ডাঃ জুলফিকার আলী, আ ফ ম সফিয়্যুল্লাহ, প্রিন্সিপাল আমীরুল হক এবং মাওলানা নুরুজ্জামানও নেদায়ে ইসলাম কর্তৃক গঠিত এ কলেজের এডহক কমিটির সম্মানিত সদস্যগণের তালিকায় ছিলেন।

শায়খ বোরহানুদ্দীন (র)-এর প্রথম (ইনতেকাল দিবসে ৯ মে ১৯৬৫) নেদায়ে ইসলাম এডুকেশন কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৬৫-৬৬ শিক্ষা বর্ষের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকা বরাবরের দিবা ও নৈশ বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসসমূহ খোলার অনুমতি চাওয়া হয় এবং একই সময়ে ডিগ্রী ক্লাসের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়। সে সময় সম্মানিত ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন ড. ওসমান গনী সাহেব। তিনি চেয়ারম্যান, নেদায়ে ইসলামকে একদিন বলেছিলেন যে, কলেজের সমস্যাটা একটু জটিল। কারণ, নেদায়ে ইসলাম কলেজ প্রতিষ্ঠা করছে সুখের বিষয়, তবে নেদায়ে ইসলাম একই সঙ্গে কতটা কলেজ করেছে তা হিসাব করে দেখলেই বোঝা যাবে। প্রথমত দুটি, দিবা ভাগে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস এবং কমার্স, তেমনি নৈশ ভাগে। তদুপরি ডিগ্রীতে এবং তাও আবার দিবা-নৈশ উভয়টা, যা সাধারণ নিয়মে হতে পারে না। যদিও তিনি এ কথা বলেছিলেন, কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের জোরালো অনুরোধে একাডেমিক ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা তিনি করে দিয়েছিলেন। এমনিভাবে তাঁরই জামাতা প্রফেসর এমিরেটাস ডঃ মুহাম্মদ সিরাজুল হক সাহেব ডিন থাকাকালীন এক মিটিংয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এমনি জোরালো বক্তব্য রাখেন যে তিনি অবাক হয়ে যান। কারণ, তাঁর শ্বশুর সাহেবকে কোন দিন কোন বিষয়ে এমনিভাবে গুরুত্ব দিতে দেখেননি। যাক কলেজ প্রতিষ্ঠার পর একে চলমান রাখতে যে কত কষ্ট নেদায়ে ইসলামকে করতে হয়েছে, তা ভাবতে গেলে অনেক কষ্ট লাগে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন গবর্নিং বডির চেয়ারম্যান নবাব হাসান আসকরী সাহেব (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগমন্ত্রী) কলেজের ক্যাম্পাসের জন্য আহসান মনজিল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় প্রথমে নারিন্দার ৫০নং বাড়িতে ক্যাম্পাস স্থাপন হয়। পরবর্তীতে ছাত্রদের যাতায়াত সুবিধার্থে ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে কলেজটি স্থানান্তরিত করা হয় (পূর্বে যা রেডিও পাকিস্তানের ঢাকার সম্প্রচার কেন্দ্র ছিল)।

এ ছাড়া নেদায়ে ইসলামের আওতায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এতিমখানা, হিফযখানা, মসজিদ, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহিলা মাদ্রাসা, পাঠাগার, বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, কিন্ডার গার্টেন স্কুল, চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র প্রভৃতি।

শায়খ মানযূর আহমাদ (র) স্বরচিত কাসীদাগুলোতে রসূলপ্রেমের এমন স্ফুরণ ঘটেছে, যা রসূলপ্রেমিকদের অন্তরে প্রেমের জোয়ার স্পন্দন এনে দেয়। তিনি চাইতেন যেন তাঁর কবর মদিনা মুনাওয়ারায় জান্নাতুল বাক্বিতে হয়। বাস্তবেও তাই ঘটল। ২০১২ সালে তিনি হজ করতে যান এবং অক্টোবর মাসের ১ তারিখে মদিনা মুনাওয়ারায় ইনতেকাল করেন। জান্নাতুল বাক্বীতে তাকে কবরস্থ করা হয়। রসূলপ্রেমের অমর এই কবি ঐতিহ্যবাহী শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।(সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category