রবিবার, জানুয়ারি ২০, ২০১৯




রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল বিআরটিসির ৫২৪ বাস

অর্থনীতি প্রতিবেদকঃ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নেই আধুনিক ওয়ার্কশপ। নেই প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ ও পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ টেকনিশিয়ান। ফলে মেরামতের অভাবে সংস্থাটির বিভিন্ন ডিপোতে অচল পড়ে আছে ৫২৪টি বাস।

বিশেষ করে অচল ভলভো ও আর্টিকুলেটেড (জোড়াবাস) বাস নিয়ে সংস্থাটি বিপাকে পড়েছে। কারণ এসব গাড়ি কেনার সময় স্পেয়ার পার্টসের কথা চিন্তা করা হয়নি। এতে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। গত কয়েক বছরে অন্তত ২০টি রুটে বিআরটিসির বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক রুটে বাস চলাচল সীমিত করা হয়েছে। সংস্থাটির আয় কমে যাওয়ায় কর্মচারীদের বেতনও বকেয়া পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় কয়েক হাজার বেসরকারি বাস চলে। এগুলোর বেশির ভাগই ১৫-২০ বছরের পুরনো। নিয়মিত মেরামত করেই সেগুলো সচল রাখা হচ্ছে। অথচ বিআরটিসি বিদেশ থেকে দামি দামি বাস কিনলেও যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সক্ষমতার অভাবে সেগুলোর প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছে না। ফলে কয়েক বছরের মাথায় অচল হয়ে পড়ছে গাড়ি। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নামেই ওয়ার্কশপ : বিআরটিসির নিজস্ব দুটি ওয়ার্কশপ থাকলেও সেখানে বাস মেরামতের সুযোগ নেই। এরমধ্যে গাজীপুরে লগোপাড়ায় অবস্থিত সমন্বিত কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপটি (মেরামত কারখানা) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপটি মূলত সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থার হালকা গাড়ি ( জিপ, মাইক্রোবাস) এবং অল্পসংখ্যক বাস-ট্রাক মেরামতের কাজ করে থাকে। তবে এ ওয়ার্কশপে বিআরটিসির কোনো বাসের মেরামত হয় না।

জানা গেছে, গাজীপুরের ওয়ার্কশপটি ১৯৮১ সালে ১৪ একর জায়গার ওপর জাপানি কারিগরি ও আর্থিক অনুদানে নির্মিত হয়। এ ওয়ার্কশপে গাড়ি সংযোজন, বডি নির্মাণ ও গাড়ি মেরামত করা হতো। এ ওয়ার্কশপেই ভলভো দ্বিতল বাস-এর বডি সংযোজন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০৯ সালে সরকারের কাছ থেকে ৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১১১টি একতলা ও দ্বিতল গাড়ির ভারী মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয় এখানে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে বর্তমানে ওয়ার্কশপের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে এ ওয়ার্কশপের একাংশকে ডিপো হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন সংগৃহীত আর্টিকুলেটেড বাস পরিচালনা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিআরটিসির বাস চলাচল করে মূলত ১৯টি ডিপো থেকে। এরমধ্যে মাত্র দুটি ডিপোতে (কমলাপুর ও কল্যাণপুর) রয়েছে শেডের ব্যবস্থা। সেসব স্থানে গাড়ির সামান্য ত্রুটি সারাতেও দৈনিক ভিত্তিতে বাইরে থেকে টেকনিশিয়ান নিয়ে আসতে হয়। এ ছাড়া সংস্থাটির গাড়ি ধোয়ার জন্য নেই কোনো ওয়াশিং প্লান্ট। গাড়ি পরিষ্কারের কাজ ম্যানুয়ালি করা হয়।

বিআরটিসি চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া ওয়ার্কশপ ও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের (টেকিনিশিয়ান) অভাবের কথা স্বীকার করে বলেন, বাস ট্রাক ওয়ার্কশপে পাঠানো হয় না। ডিপোতে মেরামতের ব্যবস্থা থাকলেও পর্যাপ্ত দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব রয়েছে। আমরা ডিপোতে ওয়ার্কশপ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, হাতে গোনা কয়েকটি ডিপোতে গাড়ি মেরামতের জন্য শেড রয়েছে। বাকিগুলোতে কোনো শেডের ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া ওয়ার্কশপের জন্য যে ফ্যাসিলিটিজ দরকার তারও স্বল্পতা রয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, গাজীপুরের ওয়ার্কশপটি অনেক বড় ছিল। অর্থ সংকটের কারণে সেটা বন্ধ রয়েছে। এটাকে নতুন করে সচল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা গাড়ির ব্যাপারে তিনি বলেন, কোরিয়া ও চায়না থেকে যেসব বাস আনা হয়েছিল, সেগুলোর স্পেয়ার পার্টস খুবই কম ছিল। ফলে অনেক গাড়ি বসে আছে। তাছাড়া লোকাল মার্কেটে স্পেয়ার পার্টসের দাম অনেক। তেমন পাওয়াও যায় না। তবে কোরিয়ান কিছু বাসের স্পেয়ার পার্টস দায়্যু কোম্পানি থেকে আমরা পেয়েছি। আশা করি যা দিয়ে বসে যাওয়া বাসের মধ্যে ৪০টির মতো সচল করা সম্ভব হবে।

৪৮টি ভলভো নষ্ট :বিআরটিসি সূত্র জানায়, ১৯৯৯ সালে সুইডেন থেকে ৫০টি দোতলা ভলভো বাস কেনা হয়। এগুলো রাস্তায় নামানো হয়েছিল ২০০২ সালে। ৬ বছরের মাথায় নষ্ট হতে শুরু হলে মেরামত করা হয়নি ৪৮টির। ৫০টি দ্বিতল ভলভো বাসের মধ্যে এখন চলছে মাত্র দুটো। অচল বাসগুলো পড়ে আছে মিরপুর-১২ ও গাজীপুর ডিপোতে। সূত্র জানায়, এক কোটি তিন লাখ টাকা দাম পড়েছিল একেকটি বাসের। সুইডেন থেকে আমদানি করা এ বাসগুলোর জীবনকাল ধরা হয়েছিল ১৫ বছর। কিন্তু যথাসময়ে যন্ত্রাংশ লাগানো না যাওয়ায় অচল হয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিসির একজন কর্মচারী বলেন, ভলবো বাসগুলো মানসম্মত ছিল না। বাস কেনা হলেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। তা ছাড়া এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেশি।

‘শখের বশেই’ কেনা হয় জোড়াবাস: দোতলা ভলবোর চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ৫০টি জোড়াবাস। ৫৪ ফুট লম্বা এ জোড়াবাসের বাহারি নাম ‘আর্টিকুলেটেড বাস’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বাস চলছে। সেটা দেখে অনেকটা ‘শখের বশেই’ আমাদের দেশেও এটি আনা হয়। একেকটি জোড়াবাসের দাম পড়েছিল এক কোটি ১১ লাখ টাকা। এ সব বাস কেনার সময় জোড়া লাগানো অংশগুলো পুনঃস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা হয়নি। ফলে কয়েক বছরের ম্যধ্যই ২০টি বাস অচল হয়ে পড়ে। বর্তমানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বাকি বাসগুলো। জানা গেছে, বৃহত্ আকৃতির কারণে এগুলো পরিচালনায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সংস্থাটি। ট্রিপ কম হওয়ায় এ সব বাস থেকে আয়ও কমে গেছে।

অন্যান্য বাসের চিত্র: সূত্র জানায়, সিঙ্গেল ডেকার বাসের মধ্যে কোরিয়া থেকে আনা হয় ২৫৩টি, এর মধ্যে ১৮৫টি নষ্ট। চীন থেকে আনা হয় ২৪৫টি সিঙ্গেল ডেকার বাস। এর মধ্যে নষ্ট হয়ে আছে ১২৭টি। ভারত থেকে আনা হয়েছিল ৪৪৩টি সিঙ্গেল ডেকার বাস। নষ্ট হয়ে আছে ১৮৮টি। ভারত থেকে কেনা হয়েছিল ৪৫৮টি ডাবল ডেকার বাস। এর মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে ১৫২টি। সর্বশেষ ২০১২ সালে কোরিয়া থেকে কেনা ৪৫টি বাস এবং ভারত থেকে কেনা ৩০টি বাসই বিকল হয়ে গেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতায় আগুনে পুড়ে অচল হয়েছে ৫টি বাস। এর আগে ২০১০ সালে নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (এনডিএফ) ঋণে চীন থেকে কেনা ২৭৫টি বাসের মধ্যে ১১৫টিই অচল হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন ডিপোতে।

যুক্ত হচ্ছে ৬শ নতুন বাস: বিআরটিসি চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভুঁইয়া জানান, ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনের চাহিদা মেটাতে বিআরটিসি নতুন ৬শ বাস আনছে ভারত থেকে। এর মধ্যে চলতি মাসেই বিআরটিসি বহরে যুক্ত হচ্ছে ১শটি বাস। নতুন বাস যুক্ত হলেই সংস্থাটির আয় বাড়বে। বাড়বে যাত্রীসেবার মানও। তিনি বলেন, ভেহিক্যাল ট্রাফিক সিস্টেম ও ডিজিটাল রুট বোর্ড সম্বলিত একেকটি বাসের দাম ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা পড়েছে। প্রথম লটে ৪২টি বাস (ননএসি) আসছে। তিনি জানান, ৩শটি ডাবল ডেকার ঢাকা সিটির জন্য। আর ২শ এসি ও ১শ ননএসির কিছু বাস ঢাকা ও কয়েকটি আন্তঃজেলা রুটে চলাচল করবে।

আয় কমায় বেতন বকেয়া: বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন -১) মোঃ আলমাছ আলী বলেন, বিআরটিসি সরকারি সংস্থা হলেও এর আয় দিয়ে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রদান করা হয়। এরপর ঋণের টাকাও পরিশোধ করতে হয়। তিনি বলেন, বিআরটিসির বহরে গাড়ি কমে যাওয়ায় আয় কমে গেছে। পাশাপাশি বাসের ভাড়া বাড়নি। কিন্তু নতুন পে-স্কেল ঘোষণার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন ডিপোতে চালক, হেলপারসহ অন্য কর্মচারীদের বেতন বকেয়া পড়েছে।

প্রসঙ্গত, বিআরটিসির বিভিন্ন ধরনের বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৪৪৫টি। এর মধ্যে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে ৫২৪টি। কোনো কোনো বাস কেনার অল্প সময়ের মধ্যেই অচল হয়ে গেছে। সংস্থাটির মোট জনবল ২ হাজার ৭৯৩ জন। শূন্য পদের সংখ্যা ৪ হাজার ৯৬৭টি। আরো ১ হাজার ৯০৮টি নতুন পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে সংস্থার পক্ষ থেকে। বিআরটিসির সচল বাসের মধ্যে ঢাকায় চলছে ৬২০টি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি অফিসের স্টাফ বাস ২৭২টি। সাধারণ যাত্রীসেবায় নিয়োজিত রয়েছে ৩৪৮টি বাস। এর মধ্যে আবার বেসরকারি খাতে ইজারায় চলছে ৮৮টি বাস। আর ঢাকার বাইরে চলাচল করছে ৩০১টি বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category