মঙ্গলবার, মার্চ ১২, ২০১৯




পতাকার মর্যাদা ও কিছু অসঙ্গতি – – – নজরুল ইসলাম

 

গত ৩ মার্চ রাজশাহী সেনানিবাসে প্রদত্ত এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পতাকা হলো জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। তাই পতাকার মান রক্ষা করা সকল সৈনিকের কর্তব্য।’ রাজশাহী সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চারটি ব্যাটালিয়নকে বীর ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড (জাতীয় পতাকা) প্রদান শেষে দেওয়া ভাষণের একটি অংশে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, পতাকার মান রক্ষা করা কেবল সৈনিকদেরই কর্তব্য, না এটা আমাদের সব বাংলাদেশির কর্তব্য? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমরা একটু পেছনে ফিরে তাকাই। গত বছর আমরা উপভোগ করলাম বিশ্বকাপ ফুটবল-২০১৮। দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমরা বাংলাদেশিরা বিদেশি পতাকা উড়াতে অভ্যস্ত।

এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনার পর গত বছর আমরা নতুন কোনো কিছু করেছিলাম, তা হলো বিদেশি পতাকা উড়ানোর সময় তার ওপর ছোট করে আমাদের জাতীয় পতাকা যুক্ত করা। কাজটা রাষ্ট্রের কোন আইনে আমরা করেছিলাম তা পরিষ্কার না হলেও ব্যাপারটা যে আবেগের তা আমরা বুঝতে পারি। ভিন্ন একটি দেশের অনেক কিছুই আমাদের ভালো লাগতে পারে বা সমর্থন করতে পারি— শিক্ষা, গবেষণা, রাজনৈতিক বা সামরিক নীতি, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, সঙ্গীতসহ আরো অনেক কিছু। কিন্তু তা প্রকাশ করতে সেই দেশের জাতীয় পতাকা আমাদের দেশে উড়াতে হবে কেন? ফুটবল খেলায় আমরা যেমন আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল সমর্থন করি, তেমনি ফুটবল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে হয়তো ভিন্ন কোনো দেশকে সমর্থন করি। এখন যদি অন্যান্য বিষয়ে আমাদের ভালো লাগা বা সমর্থন প্রকাশ করতে আমাদের দেশে সেসব দেশের জাতীয় পতাকা উড়াতে শুরু করি, তাহলে কেমন হবে?

একটু পরিষ্কার করে বলি, আমরা অনেকেই আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা ইরানি চলচ্চিত্রের খুব ভক্ত। এখন যদি অস্কার পুরস্কার বা কান চলচ্চিত্র উৎসবের সময় আমরা ভারত বা ইরানি ছবির সমর্থনে ওই দেশের জাতীয় পতাকা আমাদের দেশে উড়াতে শুরু করি, তাহলে বিষয়টা কেমন দেখাবে! জাতীয় পতাকা ব্যবহারের কিছু বিধি-বিধান আছে। সবকিছুতে জাতীয় পতাকার ব্যবহার তার মর্যাদা বাড়াবে না। বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার পর বিদেশি জাতীয় পতাকাগুলোর কী হয় তা নিয়ে কি আমরা ভেবেছি?

লিখতে অস্বস্তি বোধ করছি, আমি অনেক গ্রামে দেখেছি বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার পর বিদেশি জাতীয় পতাকা মানুষ তাদের গৃহে বিভিন্ন দৃষ্টিকটু কাজে ব্যবহার করছেন। এক বছর পার হওয়ার পর এখনো দেশের অনেক জায়গায় বিদেশি জাতীয় পতাকাগুলো জীর্ণশীর্ণভাবে বিভিন্ন ভবনের উপর ঝুলছে। আর গত বছর আমরা যেভাবে বিদেশি পতাকা উড়ানোর সময় তার উপর ছোট করে আমাদের জাতীয় পতাকা ব্যবহার করেছি, আমরা কি নিশ্চিত বিদেশি পতাকার সঙ্গে আমাদের জাতীয় পতাকার কোনো অবমূল্যায়ন হয়নি? রাষ্ট্রীয় কোন দিবসে এবং রাষ্ট্রের কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাড়ি ও গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার হবে এবং তা কীভাবে সংরক্ষণ হবে তা নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট বিধিমালায় বলা আছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, যত্রতত্র জাতীয় পতাকার ব্যবহার আমাদের দেশপ্রেম বাড়াবে না। ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি অজুহাতে রাস্তার মোড়ের দোকানি যদি তার দোকানের উপর মাসের পর মাস জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে রাখে, কিংবা উপশহরের রাস্তা দিয়ে যে ইজিবাইক চালায়, সে যদি তার গাড়িতে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করে চলাফেরা করে, তাহলে আর বিধিমালার প্রয়োজন থাকল কোথায়! দীর্ঘদিন ধরে কোনো অসঙ্গতি চললেই তা সঠিক হয়ে যায় না। আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনেক অসঙ্গতি আমরা নিজেরাই সংশোধন করে নিয়েছি। প্রয়োজন একটু উপলব্ধি ও সচেতনতা। এটা সত্যি, বিশ্বকাপ ফুটবল বা ক্রিকেট আমাদের আবেগের জায়গা, কিন্তু ভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে বা নির্দিষ্ট সময়ের পর তার অমর্যাদা করে তো আমাদের দেশপ্রেম বাড়বে না। বরং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মর্মার্থ অনুধাবন করে আমরা সতেরো কোটি মানুষ যদি জাতীয় পতাকা (তা যদি ভিন্ন দেশেরও হয়) ব্যবহার এবং সংরক্ষণে সচেষ্ট হই, তাহলেই আমাদের দেশপ্রেম বাড়বে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category