মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫, ২০১৯




ক্ষীরের জন্য বিখ্যাত মতলব

 

স্টাফ রিপোর্টারঃ ক্ষীরের জন্য বিখ্যাত মতলব। ‘মতলবের ক্ষীর, বগুড়ার দই; না খেয়ে ক্যামনে রই!’ কথাটি চাঁদপুর অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে। এক প্রসিদ্ধ খাবার ক্ষীর। চাঁদপুরের মতলবে এটি তৈরি হয়। এ ক্ষীরের সুনাম শত বছরের। আজও আছে। প্রসিদ্ধ এ ক্ষীর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করা হতো, এখনও হচ্ছে। এর চাহিদা অনেক।

সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই খাঁটি দুধে তৈরি এখানকার ক্ষীর গুণে ও মানে এখনো অটুট। ভোজনরসিকদের প্রিয় রসনা। গুণ, মান ও স্বাদের কারণে ব্রিটিশ আমলে এখানকার জমিদার ও ইংরেজদের কাছে এই ক্ষীর খুবই প্রিয় ছিল বলে জানালেন বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সদস্য উপজেলা সদরের দক্ষিণ কলাদী এলাকার বাসিন্দা অহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, তখন ক্ষীর দিয়ে বিয়ে, পূজা-পার্বণে আপ্যায়ন করা হতো।

মতলব উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত মতলবের ইতিবৃত্ত বইয়ে এই ক্ষীরের উলে¬খ আছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ওই বইয়ের ৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘মতলবের ক্ষীর খুবই প্রসিদ্ধ। সারা দেশে ক্ষীরের ব্যাপক চাহিদা ও কদরের কারণে একসময় অনেক হিন্দু পরিবার ক্ষীর তৈরি এবং ক্ষীরের পাত্র বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকত। এখনো এই ক্ষীরের চাহিদা সর্বত্র।’ উপজেলা সদরের কলেজ রোডে অবস্থিত ক্ষীর বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নন্দকেবিন। দোকানটির মালিক সঞ্জয় ঘোষ বলেন, পাঁচটি কারণে এখানকার ক্ষীর গুণে ও মানে সেরা। প্রথমত, গৃহস্থের কাছ থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি দুধ দিয়ে এই ক্ষীর বানানো হয়। দ্বিতীয়ত, দুধ ও চিনি মিশ্রণের অনুপাতে হেরফের হয় না। এক কেজি ক্ষীর বানাতে পাঁচ কেজি দুধ ও ৫০-৬০ গ্রাম চিনি মেশানো হয়। তৃতীয়ত, ক্ষীরে ময়দা বা আটা মেশানো হয় না। চতুর্থত, দুধের ননি ওঠানো হয় না। ননিসহ ক্ষীর বানানো হয়। পঞ্চমত, লাকড়ির চুলায় ক্ষীর তৈরি করা হয়।

উপজেলা সদর বাজারের আনন্দ খির-ঘরের মালিক উৎপল ঘোষ বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই উপজেলা সদরের ঘোষপাড়া এলাকার গান্ধী ঘোষের পূর্বসূরিরা ক্ষীর তৈরি শুরু করেন। খাঁটি ও স্বাদের কারণে তখন এলাকায় এই ক্ষীরের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের দেখাদেখি কলাদী ও বাইশপুর গ্রামের দাসপাড়ার আরও ১৫-২০টি হিন্দু পরিবার এ কাজে নামে। বর্তমানে ঘোষপাড়ার সুনীল ঘোষ, মিলন ঘোষ, গান্ধী ঘোষ, অনিক কুমার ঘোষ, উৎপল ঘোষ এবং দাসপাড়ার মাখনলাল ঘোষ, নির্মল ঘোষসহ কয়েকটি পরিবার ক্ষীরের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা মতলব বাজারে এনে দুধ বিক্রি করতেন। ওই সময় মতলবের ঘোষপাড়া ছিল বর্তমানে তেমন গাভীর দুধ না পাওয়ায় এবং ক্ষীর তৈরির অন্য দ্রব্য সামগ্রী সহজলভ্য না হওয়ায় ক্ষীরের দাম তুলনামূলক একটু বেশি।

মতলবের ঘোষপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষীর ব্যবসায়ীদের পরিবারের সদস্যরা ক্ষীর তৈরির কাজে ব্যস্ত। আবার কেউ কেউ এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। ক্ষীর বানানো পদ্ধতিতে সম্পর্কে উৎপল ঘোষ জানান, প্রতিদিন সকালে গৃহস্থের কাছ থেকে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে রাখা হয়। দুপুরে এসব দুধ বড় পাত্রে রেখে চুলায় দুই ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া হয়। ক্ষীর তৈরি হলে ছোট ছোট পাত্রে আলাদাভাবে রাখা হয়। পরে মাটির পাত্রে ক্ষীর রেখে ফ্যানের বাতাসে কিছুক্ষণ রাখার পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে এক কেজি দুধের দাম ৭০-৮০ টাকা। চিনিসহ অন্যান্য খরচ মিলে এক কেজি ক্ষীর বানাতে খরচ পড়ে ৪০০ টাকা। প্রতি কেজি ক্ষীরের দাম পড়ে ৪৫০-৪৬০ টাকা।

গান্ধী চরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক প্রয়াত গান্ধী ঘোষের ছেলে কাউন্সিলর কিশোর কুমার ঘোষ জানান, মতলব ক্ষীরের জন্য বিখ্যাত। আগে প্রকৃত ক্ষীর কিনতে পারতাম। এখন বেশি মূল্য দিয়েও প্রকৃত ক্ষীর পাওয়া দুর্লভ। এদিকে এখনও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ক্রেতারা এসে ক্ষীর কিনছেন। দুধের মূল্য কম হলেই স্বল্প দামে প্রকৃত ক্ষীর পাওয়া যায়। এ প্রসিদ্ধ খাবারটি সবার পছন্দনীয় হলেও হতদরিদ্র মানুষরা অর্থের জন্য তা কিনে খেতে পারছেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category