বৃহস্পতিবার, মে ২১, ২০২০




করোনার প্রভাব ও ত্রান বিতরণ ব্যবস্থাপনা

**মোঃ জাকির হোসেন সরকার**

কিছু লিখতে মন চাচ্ছিল, তাই লিখতে বসে গেলাম। যা বর্তমান সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন মহামারী করোনা । করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগপূর্ন মুহুর্তে আমাদেরকে ভাবতে হবে।
১) ত্রান ব্যাবস্থাপনা ও ত্রান বন্টন কৌশল নিয়ে।
২) Daily Payment Employee পরিবারের খন্ড চিত্র এবং পারিপার্শিক অবস্থা।
৩) ভোগ্যপণ্য বিতরন সমস্যা ও প্রতিকার।
৪) করোনা ভাইরাসের গতি প্রকৃতি ও বর্তমান অবস্থা।
৫) লকডাউন প্রসঙ্গ।

 

১) ত্রান ব্যবস্থাপনা ও ত্রান বন্টন কৌশল :
আমাদের দেশে খাদ্য সংকট হবেনা কিন্তু টাকার অভাবে মানুষ খাদ্য কিনতে পারবেনা।
ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৫০ লাখ ফ্যামিলির মাঝে ২৫০০ টাকা করে প্রতি ফ্যামিলিতে প্রদান করেছেন এটা একটা ভালো সংবাদ। এই ভাতা দেওয়া হয়েছে যারা দারিদ্র সীমার নীচে বাস করে তাদেরকে কিন্তু যারা দারিদ্র সীমার কিছুটা উপরে বাস করে তাদের জন্য কোন ভাতা নেই। সরকারী কোন ভাতা কর্মসূচীতে তাদের নাম নেই। দারিদ্র সীমার কিছুটা উপরে থেকেও তারা কিন্তু দারিদ্র সীমার নীচে ইতিমধ্যে অবস্থান করছে কাজ না থাকার কারনে। তাই তাদের জন্য সুসম বন্টনের মাধ্যমে ত্রানের ব্যাবস্থা করতে হবে। সরকার এখন যে ত্রান সামগ্রী দিচ্ছ তা দিয়ে ৫০% লোকদের কাভার করা যেতে পারে বাকী ৫০% বেসরকারী পর্যায়ের বিত্তবান লোকদের কাছ থেকে একটা কর্মসূচীর মাধ্যমে নেয়া যেতে পারে। আমি এই কারনে বলছি বেসরকারী পর্যায়ের কথা।

আমি যদি আমার এলাকার কথা বলি তাহলে দৃশ্যটা স্পষ্ট হবে। আমাদের গ্রাম ও আশেপাশের বেশ কিছু গ্রামের যুবকরা সংগঠিত হয়ে প্রবাসী ভাইদের কাছ থেকে এবং দেশের বিত্তবান লোকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেই অর্থ দিয়ে ত্রান সামগ্রী সুষ্ঠুভাবে সরবরাহ করেছেন। এখানে প্রবাসী ভাইয়েরা দেশের মানুষের প্রতি অনেক বেশী উৎকন্ঠা ও আগ্রহ নিয়ে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসছেন। তারা নিজের কথা চিন্তা না করে দেশের মানুষের কথা প্রতিনিয়ত চিন্তা করছেন এবং প্রচুর সাহায্য করে যাচ্ছন এর জন্য প্রবাসী ভাইদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সরকারী পর্যায়ে আমাদের এমপি মহোদ্বয় গভীর ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে প্রয়োজনীয় ত্রান সামগ্রী বিতরন করছেন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। যা তিনি প্রশংসার দাবিদার। তিতাস উপজেলা চেয়ারম্যান নিজে থেকে কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার পরও কথা থেকে যায় আমরা কি সব ফ্যামিলিতে খাদ্য সরবরাহ করতে পারছি ? সারা দেশে কি সবাই খেয়ে আছে ? না খেয়ে থাকলে আমরা কতটুকু খবর রাখতে পারছি। এর জন্য গ্রাম, পাড়া, মহল্লা ভিত্তিক কমিটি করে খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহন করার অনুরোধ করছি।

প্রত্যেকটা পাড়া মহল্লায় কিন্তু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অলস সময় কাটাচ্ছে, তাদেরকে সমন্বয় করে দ্বায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। প্রতি গ্রাম, মহল্লা থেকে ৫ জনকে ত্রান বন্টনের দ্বায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার যে সমস্ত শিক্ষকরা বসে আছে তাদেরকে প্রধান সমন্বয়কের দ্বায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। যেই গ্রাম বা মহল্লায় তারা যত টাকা কালেকশন করবে ঠিক সমপরিমান টাকা সরকারকে দিতে হবে এই দুইয়ে মিলে উক্ত টাকা অএ এলাকায় ত্রান সামগ্রী বিতরন করা যেতে পারে। প্রত্যেক এলাকায় সংসদ সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নিজস্ব তদরকিতে উক্ত কাজ সম্পাদন করা যেতে পারে। উক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ত্রান বিতরন শুরু করতে হবে প্রান্তিক পর্যায়ের লোক থেকে।
পৃথিবীর কোন দেশের সরকারের একার পক্ষে মহামারী সামাল দেয়া সম্ভব নয়। এর জন্য বেসরকারী খাতের লোকদেরকে এগিয়ে আসতে হবে।

উন্নত দেশগুলো জোড় দিয়েছে চিকিৎসার উপর আমাদেরকে জোড় দিতে হবে ভাতের উপর।

প্রয়োজন বোধে গ্রাম, মহল্লা পর্যায়ে লঙ্গরখানা খুলতে হবে। খিদায় যেন কোন লোক কষ্ট না পায়। টাংগাইলের এক বালক ওএমএস এর চাল বন্টনের জন্য একটি অ্যাপ তৈরী করেছে যা ব্যবহার করে অত্র এলাকার প্রশাসন সুষ্ঠুভাবে চাল বিতরন করতে পারছে। সেই অ্যাপটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

 

২) একটি Daily Payment Employee পরিবারের খন্ড চিত্র এবং পারিপার্শিক অবস্থা:
একটি দিনমজুর পরিবার। সদস্য সংখ্যা ৬ জন। থাকেন ঢাকায়। পরিবারে পরিশ্রমক্ষম ব্যাক্তি দুইজন বাবা আর বড় ছেলে। দুইজনই Daily শ্রমিক। বাবা কাজ করেন একটি নির্মানাধীন প্রাসাদের নির্মান শ্রমিক হিসেবে আর ছেলে কাজ করেন ঢাকা শ্যামবাজারের ডেলিভারিম্যান হিসেবে। দেড়মাস যাবৎ তারা ঘরে বসা। কোন কাজ নেই। প্রথম ১৫/২০ দিন তেমন কোন সমস্যা হয়নি। এরপর থেকে ধারদেনা করে চলা। তারপর আর চলতে পারছেন না। তাই রাতের আধারে খাবার সংগ্রহের জন্য বের হন বাপ ছেলে। কোন দিন সাহায্য পেলে খাবার জোটে আর সাহায্য না পেলে খাবার জোটেনা। অনাহারেই পরে থাকেন পরিবারের সবাই। তারা এখন অসহায়। এভাবে শ্রমিক, রিকসাওয়ালা, ফেরিওয়ালা ও দিনমজুর সহ অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষের আয় রোজগারের পথ হয়ে পরেছে রুদ্ধ।
যে সমস্ত দোকানদার ভাইদের দোকান বন্ধ হয়ে আছে সেগুলোর অর্ধেক ভাড়া সরকার বহন করলে ভালো হয়। বিশেষ করে কাপড়ের দোকান, মনোহরী দোকান, ইলেকট্রিক, ইলেকট্রিকেল দোকান, হোটেল, হার্ডওয়ার, মোবাইল ফোনের দোকান ও সেলুন দোকান।

কৃষি জমিতে কৃষিপন্য উৎপাদনে যারা জড়িত বিশেষ করে ধান, পাট, শাকসব্জি, ডিম, দুধ উৎপাদনে যারা জরিত তারা ক্ষতিগ্রস্থ। তাদের ক্ষতি পুশিয়ে নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রদান করতে হবে নগদ অর্থ সহায়তার মাধ্যমে।

জীবন না জীবিকা কোনটি প্রয়োজন বেশী। এই বিতর্কের অবসান ঘটানোর জন্য সম্প্রতি যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে WHO (ওয়ার্ড হেলথ অরগানাইজেশন) এবং IMF (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) তারা যৌথ নামে একটি লেখা প্রকাশ করেছে। লেখাটার শিরোনাম হচ্ছে “জীবন রক্ষা না চাকুরী রক্ষা” এ দুই সংস্থার দুজনই বলেছেন দুটোই একসংগে চালিয়ে যেতে হবে।

 

৩) পণ্য বিতরন সমস্যা ও প্রতিকার:
পণ্য বিতরনের আগে প্রয়োজন পণ্য উৎপাদনের প্রযোজনীয় রমেটেরিয়াল, প্যাকেজিং, পণ্য উৎপাদন শ্রমিক এবং ভিহিকেল ব্যাবস্থা ঠিক করা। করোনা ভারাসের কারনে প্রতিটা সেক্টরে লোকের সল্পতা দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের মাঝে আতন্ক বিরাজ করছে। কর্মক্ষেত্রে লক্ষনীয় পর্যায়ে লোকের অনুপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। রমেটেরিয়াল বাহির থেকে আনতে হলে আমাদের বন্দরে এসে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে জাহাজগুলোকে। প্যাকেজিং কোম্পানীগুলো নির্ধারন সময়ের মধ্যে রেপার সরবরাহ করতে পারছেনা। যা সঠিক সময়ে পণ্য উৎপাদনে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। একটি কোম্পানী তার বাৎসরিক লক্ষমাত্রা সাজিয়ে থাকে এর আগের বছরের সেলস এর উপরে ভিত্তি করে। কনজ্যুমার বৃদ্ধিরও একটা লক্ষমাত্রা নেয়া হয়। Employee সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন মার্কেটিং প্রমোশনাল এক্টিভিটিজের উপর লক্ষ রেখে সেই অনুপাতে প্রডাকশন ও রমেটেরিয়াল আনার ছক তৈরী করেন এবং টাইম লাইন নির্ধারন করেন। হঠাৎ যদি বড় কোন ডিমান্ড তৈরী হয় তখনই সাপ্লাই চেইনে বিপত্তি ঘটে যেমনটা এখন লক্ষ করা যাচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানীর বেলায়। তাই উক্ত সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন আগাম বার্তা সংগ্রহ করতে হবে। সেই অনুযায়ী রিওয়ার্ক করে প্রতিকারের ব্যাবস্থা করা যেতে পারে।

 

৪) করোনা ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি ও বর্তমান অবস্থা:

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পৃথিবীর অনেক দেশেই কমতে শুরু করেছে কিন্তু বাংলাদেশ তার ব্যাতিক্রম। প্রতিনিয়ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। সস্থির জায়গা হলো মৃত্যু তুলনামূলক কম। অবস্থার দৃষ্টিতে মনে হয় ইউরোপ ও অ্যামেরিকার তুলনায় আমাদের দেশের ভাইরাসগুলো তুলনামূলক দুর্বল। যেটা শুনা যায় শীতের দেশে এই ভাইরাস বেশী শক্তিশালী হয়ে মানুষকে এটাক করে। তারপরও আমাদেরকে অনেক বেশী সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। আক্রান্তের হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে। বর্তমানে পৃথিবীতে আজ(১৫মে) পর্যন্ত ৪৫,৪৬,৩১১ (পয়তাল্লিশ লাখ ছিচল্লিশ হাজার তিনশত এগার) জন আক্রান্ত হযেছে এবং ৩,০৩,৮৮০ (তিন লাখ তিন হাজার আটশত আশি) জন লোক মৃত্যু বরন করেছে। বাংলাদেশে আজ আক্রান্ত হয়েছে ১২০২ জন সবমোট আক্রান্ত ২০,০৬৫ (বিশ হাজার পয়শট্টি) জন এবং মৃত্যু বরন করেছেন ২৯৮ (দুইশত আটান্নব্বই) জন। আশার খবর হলো মার্কিন ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন পেয়েছে করোনা ভাইরাসের ঔষধ। রেমডেসিভির নামে ঔষধ চলতি মাসেই বাংলাদেশে পাওয়া যাবে।

 

৫) লকডাউন প্রসঙ্গ:

বাংলাদেশের শ্রমজীবি মানুষের ৮৫% কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। বাকী ১৫% আনুষ্ঠানিক খাতে। দীর্ঘ সারির এই মানুষ গুলোকে আগে সস্থির একটা যায়গায় নিয়ে যেতে পারলেই কেবল লকডাউন সফল হবে। জনগনের টাকা জনগনের পিছনে খরচ করার ব্যাবস্থা করতে হবে। সচ্ছ ও সৎ লোকদেরকে এান ব্যবস্থাপনা রাখতে হবে। লকডাউনের সময় সরকার যে ছুটি কার্যকর করেছেন তা না করে ঘরে বসে অফিস করার ঘোষনা দিলে ভালো হত। তাহলে লোকজন একটা ম্যাসেজ পেয়ে যেত বসে থেকে খাওয়ার সুযোগ নেই এবং ডিজিটাল কর্মকান্ডে আরও বেশী পারদর্শী হয়ে উঠতে পারতো। আমরা যারা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি আমরা কিন্তু বাসায় বসে অফিস থেকে বেশী সময় কাজ করছি। পরিবারকে সময় দিয়ে আনন্দের সহিত আরো অনেক বেশী কাজ করা যাচ্ছে। পৃথিবীতে অনেক কোম্পানী আছে যাদের এমপ্লয়িদের অফিসে না যেয়ে বাসায় বসে কাজ করার সুযোগ রযেছে।
সর্বপরি সরকারের দুরদর্শী সিদ্ধান্তের কারনে আমরা অন্য আরো অনেক দেশ থেকে ভালো অবস্থানে অবস্থান করছি। শহরে আইসোলেশন সেন্টার চালুর কথা শুনেছি কিন্তু উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে লোকদের আইসোলেশন সেন্টারের কথা শুনিনি। যাদের বাড়ীতে একের অধিক রুম নেই তারা কিভাবে আইসোলেশনে যাবে।
ধান কাটার দিনমজুর, রিকসাচালক, ফেরিওয়ালা ও চা বিক্রেতাদের সীমিত সময় বেধে কাজ করতে দিলে ভাল হয়। আজকে আমার এই লেখা ডঃ মীজানুর রহমান, ভিসি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, স্যার এর সম্মানে ও উৎসাহে লেখা। স্যার ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

পরিশেষে বলবো “হোপ ফর দ্যা বেষ্ট, প্রিপেয়ার ফর দ্যা ওয়েষ্ট” আমরা ভালো কিছু আশা করবো। কিন্তু প্রস্তুতি থাকতে হবে সবচেয়ে খারাপের জন্য।
যারা নিজের জীবন বাজি রেখে জাতিকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রতি অকৃতিম ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

সবাই সুস্থ্য ও নিরাপদ থাকুন।

আল্লাহ আমাদের সহায় হউন।

সবাইকে ধন্যবাদ,

মোঃ জাকির হোসেন সরকার

জেনারেল ম্যানেজার, এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডস

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category