বুধবার, মে ২০, ২০২০




কভিড-১৯ : ঝুঁকিতে গণমাধ্যমকর্মীদের চ্যালেঞ্জ

১.
বৈশ্বিক মহামারি ঝড়ে সব কিছু লন্ড-ভন্ড। গণমাধ্যমকেও ছাড় দেয়নি।ওলট-পালট করে দিয়েছে গণমাধ্যম শিল্পকে। সাংবাদিকতাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগ থেকে আত্মরক্ষার কথা ভুলে গিয়ে আক্রান্ত, মৃত্যু, জানাযা-দাফন, লকডাউন, কারফিউ খবর প্রচার প্রকাশে গণমাধ্যমকর্মীদের অন্তহীন পথচলা থেমে নেই। পাঠক-দর্শক-শ্রোতার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জিং সাংবাদিকতায় সারাদেশে এ পর্যন্ত করোনায়ভাইরাসে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চারজন সাংবাদিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। অন্তত ১শ’ ৩৩জন গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল ও ঘরে-বাইরে এখনো চিকিৎসাধীন।
ডিসেম্বরের শুরুতে চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের আঘাত শুরু হলেও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশেও আগাম প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। ফলে চিরচেনা জনপথ ক্রমাম্বয়ে অচেনা হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দিতে, প্রশাসন সুরক্ষা দিতে এবং গণমাধ্যমকর্মীরা মহামারির তথ্যসেবা দিতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয়েছে। আচমকা উড়ে আসা এ মহামারি থেকে কীভাবে, কী উপায়ে নিজেকে সুরক্ষা দেয়া যায়, সে বিষয়ে সবার জানাও ছিল না। ছিল সুরক্ষা সামগ্রীরও অভাব।
করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারে যেসব পেশাজীবীর নাম বড় ঝুঁকির তালিকায় উঠে আসছে, তাদের মধ্যে সবার আগে আছেন ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। কিন্তু যাদের নাম কেউ বলছে না, তারা হলেন এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে মানুষকে তথ্যসেবা দিয়ে যাওয়া সাংবাদিকরা। বাংলাদেশে সবচেয়ে বিপদে থাকাদের দলে সাংবাদিকরাও যে আছেন, তার বড় প্রমাণ হলো ইতিমধ্যে দেশের অন্তত ৮০ জন গণমাধ্যমকর্মীর করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের খবর। এমনটাই মনে করছেন সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। তিনি এক নিবন্ধনে লিখেছেন, বাংলাদেশের নিবেদিতপ্রাণ গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ও সাংবাদিকরা দৃঢ় মনোবল ও দায়িত্ববোধ থেকে সাধারণ নাগরিকদের খবর পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম অতীতে অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। তবে এবারের মতো বৈরী পরিস্থিতি সাম্প্রতিককালে আর আসেনি।
২.
‘করোনাভাইরাস’একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর প্রভাবে সংবাদপত্র শিল্প ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে । দেশের অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান,  দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সংবাদপত্রে পাঠক কমে গেছে। এ অবস্থায় বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিচ্ছেন। ফলে গনমাধ্যম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। লকডাউন, কারফিউ কিংবা চলাচলে নিয়ন্ত্রণের কারণে ছাপা কাগজ বিতরণ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ  কারণে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। তবে অনলাইনে পাঠকসংখ্যা বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে ‘সংবাদপত্র প্রিন্ট ভার্সনের মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণ হয় না। কাগজের মাধ্যমে এ ভাইরাস বহন হয় না, বা বেঁচে থাকতে পারে না।’ দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও পাঠক সংখ্যা ধরে রাখা যায়নি। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে এই আশঙ্কায় মানুষ কাগজের তৈরি পত্রিকা হাতে নিচ্ছেন না। ফলে সব পত্রিকা ছাপানোর সংখ্যা কমে গেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা ছাপা বন্ধ রেখেছে। শুরু হয় প্রিন্ট ও ইলেক্টনিক্স মিডিয়ায় লোকবল ছাঁটাই। ইতিমধ্যে কয়েকশ’ সাংবাদিক চাকুরী হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি অনেকটাই উপেক্ষিত। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও তারা কোন ভাতা বা প্রণোদনা পান না। দীর্ঘ ৩০ থেকে ৪০ বছর কাজ করে একজন অবসরে যাওয়া সাংবাদিকের অনেকটা খালি হাতে বিদায় নিতে হয়। আবার কঠিন কোনো অসুস্থ হলেও অর্থের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হয়।
৩.
করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ লাঘবে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করেছেন। কিন্তু সাংবাদিকের বিষয়ে সরকারিভাবে কোন প্রণোদনার খবর মিলেনি। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মমতাজউদ্দিন সাহেব স্বাক্ষরিতপত্রে দেশের জেলা প্রশাসকদের কাছে পত্র প্রেরন করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, করোনাভাইরাস দুর্যোগকালীন সময়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের তালিকা প্রনয়ন করে যাতে সরকারের তরফ থেকে প্রণোদনা দেয়া হয়। এ ঘটনার দু’দিন পর তিনি আরো একটি চিঠি দিয়ে পূর্বের চিঠি প্রত্যাহার করে নেন। প্রেস কাউন্সিলের চিঠি দেয়া-নেয়ার বিষয়টি এখনো রহস্যাবৃত রয়ে গেল।
এপ্রিল মাসের প্রথমদিকে চাঁদপুর প্রেসক্লাব গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বিলিকারকদের কল্যানে উদ্যোগ গ্রহন করে। স্থানীয় প্রশাসন ও কয়েকজন সমাজকর্মীর সহযোগিতায় তাদেরকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ও কিছু খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়। খাদ্য সহায়তায় সরকারি অংশগ্রহণ থাকায় অনেকের ভ্রæকুচকানি লক্ষ্য করা গেছে। সোস্যাল মিডিয়ায় গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে তারা বিষদগার করেছেন। তাদের ধারণা গণমাধ্যমকর্মীরা ভিন গ্রহের মানুষ। সরকারি সহযোগিতা তারা পেতে পারেনা। পরে অবশ্য বিষদগারকারীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাও চেয়েছে। অথচ করোনা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবৃত্ত শ্রেণীর উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকারি ত্রান নিতে কেউ লজ্জা পাবেন না। এটা ভিক্ষা নয়, জনগনের টাকায় রাষ্ট্রীয় শস্য ভান্ডারে আপনার অধিকার।’
সাংবাদিকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টির লক্ষ্যে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান ও তাদের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমÐলীর সদস্য, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, করোনাযুদ্ধে ফ্রন্টফাইটার সাংবাদিকরা। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহর ও মফস্বল অঞ্চলে দিন রাত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন খবর, সরকারি ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ তৎপরতাসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল সুবিধা-অসুবিধার সংবাদ মাঠে থেকে সংগ্রহ করছেন।এই অবস্থায় সাংবাদিকদের আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাসহ অন্য বিষয়গুলো কার্যকর করতে এগিয়ে আসতে তথ্যমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।
করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া প্রত্যেক সংবাদকর্মীর জন্য বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। তারা গণমাধ্যমের অগ্রগতি ও সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে বেশ কিছু প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরেন।
৪.
বৈশ্বিক মহামারির সময়ে হোমকোয়ারেন্টাইনে থাকা পাঠক-দর্শক-শ্রোতার রুচির পবির্তন ঘটেছে, চাহিদা ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছে। এ অবস্থায় তথ্যসেবায় আস্থা ও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পাঠকের অন্তরে টিকে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে-এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং সরকারের তরফে প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ঝুঁকি এড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশনে অধিকতর তাগিদ দেয়া যেতে পারে।
কোয়ারেন্টাইন জোন, রোগের হটস্পট, ত্রাণবিতরণ কেন্দ্র, বাজার ও জনসমাগমস্থল গেলে অবশ্যই সাংবাদিকদের পিপিইসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে যেতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিটি ইকুইপমেন্ট কাজশেষে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। পেশার প্রতি শতভাগ অনুগত ও অবিচল থাকতে হবে, তবে জীবনের মায়া ছেড়ে নয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের চরম মূল্য দিতে হবে।
লেখক:বিএম হান্নান
সাংবাদিক ও নাট্যজন
bmhannan73@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category