বুধবার, মার্চ ২৫, ২০২০




কবি কায়কোবাদের জন্মদিন আজ

মো. নাছির উদ্দীন : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি ছিলেন কায়কোবাদ। অজপাড়া গ্রামে পোস্টমাস্টারির চাকরি করেছেন জীবনভর, আর লিখেছেন কবিতা। এই কাব্যচর্চাই তাঁকে এনে দিয়েছে মহাকবির খ্যাতি। আজ ২৫ মার্চ তাঁর জন্মদিন, ১৯৫৭ সালের এ দিনে ঐতিহাসিক সিপাহি বিপ্লবের বছর বর্তমান ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের আগলা-পূর্বপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা শাহামতুল্লাহ আল-কোরায়েশি ছিলেন ব্যারিস্টার, ঢাকা জেলা জজকোর্টে আইন ব্যবসা করতেন। সেই সুবাদে কায়কোবাদের পড়াশোনা ঢাকাতেই হয়েছিল।
কালের লিপিতে ‘মহাকবি কায়কোবাদ’ নামে তিনি উৎকীর্ণ হয়ে থাকলেও তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম কাজেম আল-কোরায়েশি।

সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়াশোনা কালে পিতার মৃত্যু হয়, কায়কোবাদ স্কুলের বদলে তখন ভর্তি হন মাদরাসায়, ঢাকা মাদরাসা, যেটা বর্তমানে নজরুল কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু মাদরাসায় প্রবেশিকা পর্যন্ত পড়াশোনার পর পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পোস্ট মাস্টারির চাকরি পেয়ে যান তিনি, পিতৃহীন পরিবারের ঘানি টানতে প্রবেশিকা পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি কায়কোবাদের। পোস্টমাস্টারির চাকরি নিয়ে ফিরে যান আপন গ্রামে। এবং অবসরগ্রহণ অবধি গ্রামেই থাকেন পোস্টমাস্টারির চাকরি নিয়ে। আর করেন কাব্যসাধনা।

অতি অল্পবয়সে কায়কোবাদের সাহিত্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্য বিরহবিলাপ (১৮৭০) প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কুসুম কানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৫), মহাশ্মশান (১৯০৪), অমিয়ধারা (১৯২৩), মহরম শরীফ (১৯৩২), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম-পারিজাত (১৯৭০), গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ (১৯৭৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি বাংলা একাডেমী কায়কোবাদ রচনাবলী (৪ খন্ড, ১৯৯৪-৯৭) প্রকাশ করেছে।

কায়কোবাদের মহাশ্মশান একটি বিখ্যাত মহাকাব্য। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘মহাশ্মশান’। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা এবং এর দ্বারাই মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। কাব্যটি তিন খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডে ঊনত্রিশ সর্গ, দ্বিতীয় খন্ডে চব্বিশ সর্গ, এবং তৃতীয় খন্ডে সাত সর্গ। মোট ষাট সর্গে প্রায় নয়শ’ পৃষ্ঠার এই মহাকাব্য বঙ্গাব্দ ১৩৩১ মুতাবেক খ্রিষ্টাব্দ ১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়; যদিও গ্রন্থাকারে প্রকাশ হতে আরও ক’বছর দেরি হয়েছিল। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধযজ্ঞকে রূপায়িত করতে গিয়ে কবি বিশাল কাহিনি, ভয়াবহ সংঘর্ষ, গগনস্পর্শী দম্ভ, এবং মর্মভেদী বেদনাকে নানাভাবে চিত্রিত করেছেন এ মহাকাব্যে। কায়কোবাদের গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে।

তাঁর কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ে বিশ্বাসী, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন।

বাংলা মহাকাব্যের অস্তোন্মুখ এবং গীতিকবিতার স্বর্ণযুগে মহাকবি কায়কোবাদ মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে কাহিনি নিয়ে ‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্য রচনা করে যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় আসনে স্থান করে দিয়েছে।

সেই গৌরবের প্রকাশে ১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫) উপাধিতে ভূষিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category